➤চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ডাকাতি, মাদক ও মানবপাচার রোধে মহেশখালী থানার ওসির নেতৃত্বে সাঁড়াশি তৎপরতা
গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের, মহেশখালী (কক্সবাজার):: কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী একসময় শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পায়ন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কারণে অঞ্চলটি এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত এলাকায় পরিণত হয়েছে। তবে উন্নয়নের এই বিশাল সম্ভাবনার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিস্তার লাভ করেছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক কারবার, ডাকাতি, জলদস্যুতা ও মানবপাচার চক্রের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, জেলে, পরিবহন শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, মহেশখালীর কিছু দুর্গম উপকূলীয় এলাকা ও বিচ্ছিন্ন চর দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের নিরাপদ রুট ও আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। বিশেষ করে সাগরপথ ব্যবহার করে ইয়াবা পাচার, অবৈধ অস্ত্র পরিবহন, ডাকাতি এবং মানবপাচারের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে বহুদিনের।
সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালী থানা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও রাতভর টহলের কারণে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আব্দুস সুলতানের নেতৃত্বে পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযানে অপরাধীচক্রের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, গভীর রাত হলেই কিছু উপকূলীয় ঘাট ও সাগরপথে সন্দেহজনক ট্রলার চলাচল করত, যা মাদক, মানবপাচার ও অবৈধ অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। রাতের আঁধারে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র উপকূলীয় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাত এবং মাছ ধরার ট্রলার, লবণ পরিবহন কিংবা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চাঁদা দাবি করত। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একসময় আতঙ্কে কেউ মুখ খুলতে চাইত না এবং রাতে সাধারণ মানুষের চলাচল কমে যেত; তবে এখন পুলিশের টহল বাড়ায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।
একইভাবে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চলে চলমান বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন অর্থনৈতিক বলয়কে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র শ্রমিক নিয়োগ, পরিবহন, বালু উত্তোলন, ঠিকাদারি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা নতুন না হলেও অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। এই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
অনুষন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মহেশখালী দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে কিছু তরুণ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চিহ্নিত মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করে নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেফতারের পাশাপাশি নতুন করে কেউ যেন এ ব্যবসায় জড়িত হতে না পারে, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। এরই মধ্যে মাদক মামলার একাধিক পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ এবং সন্দেহভাজন রুট ও ঘাট এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি, সাগরপথে বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে টার্গেট করা দালালচক্রের বিরুদ্ধেও উপকূলীয় পয়েন্ট ও ট্রলার চলাচলের রুটে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে, যার ফলে মানবপাচারের তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে।
বর্তমানে মহেশখালী থানার একাধিক টিম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত মোবাইল টহল ও রাতভর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আব্দুস সুলতান বলেন, “চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ডাকাতি, মাদক ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। মহেশখালীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে অপরাধের ধরন ভিন্ন, তাই নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা, জনসচেতনতা ও কমিউনিটি পুলিশিং একসঙ্গে চালানো হচ্ছে।”
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এজন্য প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক সমন্বয়। সেই লক্ষ্যে মহেশখালীতে বর্তমানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, পুলিশের কড়াকড়ির কারণে অপরাধীদের প্রকাশ্য তৎপরতা কমলেও অনেকে এখনও গা-ঢাকা দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সচেতন মহলের মতে, চলমান অভিযান যদি ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা যায়, তাহলেই মহেশখালীতে স্থায়ীভাবে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। উন্নয়ন ও নিরাপত্তা—দুই বাস্তবতার সন্ধিষ্ণণে দাঁড়িয়ে থাকা মহেশখালীর মানুষ এখন একটাই প্রত্যাশা করছে, উপকূলজুড়ে অপরাধের অদৃশ্য সাম্রাজ্য ভেঙে শান্তি ও নিরাপত্তার স্থায়ী পরিবেশ ফিরে আসুক।
প্রকাশক: আবদুল মাজেদ, সম্পাদক: শ.ম.গফুর, নির্বাহী সম্পাদক: হামিদুল হক, বার্তা: সম্পাদক: আজিজুল হক রানা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক: এম.রহমান সীমান্ত, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: +880 1862-779582
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত