শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ,দুর্বলতা চিহ্নিত ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ
গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের |নিজস্ব প্রতিবেদক, মহেশখালী (কক্সবাজার):: মহেশখালীর শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে এবার পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ।
বুধবার ১২ আগস্ট মহেশখালীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের সঙ্গে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন। সভায় তিনি বলেন, “রেজাল্ট বিপর্যয় হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তদারকি করা হবে।” শিক্ষার মানোন্নয়নকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পাঠদানের গুণগত মান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় উঠে আসে। ফলাফল নিয়ে নতুন করে ভাবনার তাগিদ এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর সাধারণত ভালো ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আলোচনা হলেও পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার গভীরে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এবারের মতবিনিময় সভায় সেই জায়গাটিতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট, অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির ধরন সবকিছু বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ কারণে শুধু ফলাফল প্রকাশের পর সাময়িক আলোচনা নয়, বরং পুরো শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করার ওপর জোর মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনার পাশাপাশি কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দুর্বল ফল করে, তাহলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকতা, পাঠদানের পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হলে তার কারণও অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা কঠিন। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা নজর, সভায় শিক্ষার্থীদের মেধাগত পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ একাডেমিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রেণিকক্ষে একসঙ্গে পাঠদান করলেই সব শিক্ষার্থী সমানভাবে বিষয়টি আয়ত্ত করতে পারে না। তাই নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বল শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস,পুনরাবৃত্তিমূলক পাঠদান এবং শিক্ষক-অভিভাবকের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার কয়েক মাস আগে নয়, শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর তাগিদ মহেশখালী উপজেলায় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করছে, তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক দিকগুলোও পর্যালোচনা করার কথা উঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সফল কৌশল নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষক- শিক্ষার্থীর যোগাযোগ, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা, অভিভাবক সভা ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা গেলে সামগ্রিক ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব সভায় শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করবেন, এমন নয়; শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষকের ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং পাঠদানের মান যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। ফলে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পড়াশোনার অগ্রগতি, দুর্বল বিষয় এবং আচরণগত পরিবর্তন সম্পর্কে অভিভাবকদের অবহিত করা হলে শিক্ষার্থীর প্রতি পরিবার ও বিদ্যালয় দুই জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ‘রেজাল্ট’ নয়, শিক্ষার মানও বিবেচনায়,সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল শিক্ষার মানকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার না করা। পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা,শৃঙ্খলা,নৈতিকতা,জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সমন্বিত তদারকির প্রত্যাশা।
সভায় উপস্থিত ছিলেন মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম, সভায় সভাপতিত্ব করেন মহেশখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান।শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রশাসন, মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের সমন্বিত উদ্যোগে ফলাফলভিত্তিক একটি কার্যকর তদারকি কাঠামো গড়ে উঠবে। এতে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে। করণীয় নির্ধারণে প্রয়োজন ধারাবাহিক মনিটরিং শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, ফল বিপর্যয়ের পর শুধু সভা করে দায়িত্ব শেষ করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। সভায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিক মনিটরিং প্রয়োজন।
বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ; শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ; শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা; দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস; নিয়মিত অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন; অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় বৃদ্ধি; ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সফল পদ্ধতি অনুসরণ; পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত একাডেমিক তদারকি এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে মহেশখালীর শিক্ষার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহির নতুন বার্তা, এবারের মতবিনিময় সভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলকে আর শুধু বার্ষিক একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা হবে না; বরং ফলাফলকে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় তদারকি করা হবে।
এতে ভালো ফলাফল অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা পাবে, তেমনি ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।মহেশখালীর শিক্ষার মানোন্নয়নে বুধবারের এ মতবিনিময় সভাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ফলাফল পর্যালোচনার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে আগামী দিনে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত তদারকি কতটা নিয়মিত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। সভায় উচ্চারিত “রেজাল্ট বিপর্যয় হওয়া প্রতিষ্ঠান গুলোর বিষয়ে তদারকি করা হবে” এই ঘোষণা এখন বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই মহেশখালীর শিক্ষা অঙ্গনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রকাশক: আবদুল মাজেদ, সম্পাদক: শ.ম.গফুর, নির্বাহী সম্পাদক: হামিদুল হক, বার্তা: সম্পাদক: আজিজুল হক রানা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক: এম.রহমান সীমান্ত, বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: +880 1862-779582
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত