
গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের, মহেশখালী (কক্সবাজার):: কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লবণচাষ, মৎস্যসম্পদ ও নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য সবসময়ই আলোচিত। তবে এবার এই উপকূলীয় জনপদ নতুন এক গৌরবময় অধ্যায়ের কারণে দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের মেধাবী সন্তান ইয়াসির আহমেদ জীম এবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা তুলে ধরতে যাচ্ছেন। আগামী ১৫ থেকে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য ১০ম দক্ষিণ এশিয়া দলীয় ক্যারাটে কাতা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেবেন মহেশখালীর এই কৃতি সন্তান। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সেরা প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মর্যাদাপূর্ণ আসরে জীমের নির্বাচিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো মহেশখালী জুড়ে আনন্দ ও গর্বের বন্যা বইছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসির আহমেদ জীম বর্তমানে দেশের শীর্ষ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এর ক্যারাটে অনুষদের ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক। বিশেষ করে আত্মরক্ষামূলক ক্রীড়া ক্যারাটের প্রতি এক বুক আকর্ষণ নিয়ে তার পথচলা শুরু হয়। এরপর নিজের কঠোর অনুশীলন, অবিচল অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের জোরে জাতীয় পর্যায়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার পর দক্ষ প্রশিক্ষকদের অধীনে নিয়মিত ফিটনেস ও পেশাদার ট্রেনিং জীমকে আন্তর্জাতিক মানের ক্যারাটেকার হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ইতোমধ্যে বিকেএসপির হয়ে বেশ কয়েকটি জাতীয় ইভেন্টে দ্রুত গতি, শৃঙ্খলাপূর্ণ কৌশল ও অনন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করে প্রশিক্ষকদের নজর কাড়েন তিনি।
সম্প্রতি জাতীয় বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন এই তরুণ ক্রীড়াবিদ। সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ক্যারাটে ইভেন্টে নিজের অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ভূয়সী প্রশংসা ও স্বীকৃতি অর্জন করেন জীম।
তার এই সফলতার পেছনে পরিবারের অবদান ছিল অনবদ্য। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত ক্যারাটে অনুশীলনের জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যয় করতেন জীম। তার এই স্বপ্নপূরণে সবসময় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তার বাবা কুতুবজোম মেহেরিয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোখতার আহমেদ। একজন শিক্ষক পিতার যোগ্য সন্তানের এই আন্তর্জাতিক অর্জন স্থানীয় মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে।
কুতুবজোমের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জীম ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী, পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ। প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের একজন তরুণ যেখানে পর্যাপ্ত ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজস্ব মেধা ও বিকেএসপির সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে, তা নিঃসন্দেহে পুরো কক্সবাজারের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি। এলাকার ক্রীড়াবিদ ও সচেতন মহলের মতে, জীমের এই সাফল্য উপকূলের নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলা ও পজিটিভ কর্মকাণ্ডে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে।
জীমের এই অনন্য অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ক্রীড়া সংগঠক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমন প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের এগিয়ে নিতে সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান ও ক্রীড়াপ্রেমী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান জানান। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্যারাটের মতো আত্মরক্ষামূলক খেলার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রতিযোগিতায় জীম যদি ভালো ফলাফল বয়ে আনতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের মতো আরও বড় আন্তর্জাতিক আসরে দেশের হয়ে খেলার দুয়ার খুলে যাবে।
বর্তমানে মহেশখালীবাসীর একটাই প্রত্যাশা—দক্ষিণ এশিয়ার এই মর্যাদাপূর্ণ আসরে নিজের সেরাটা দিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখবেন ইয়াসির আহমেদ জীম। তার এই সফলতা শুধু একটি পরিবারের বা একটি দ্বীপের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে।