
নিজস্ব প্রতিবেদক, মহেশখালী (কক্সবাজার):: যাঁর স্বপ্নে আলোকিত হয়েছে একটি জনপদ এবং যাঁর কর্মে আজও বেঁচে আছে মহেশখালী, তিনি হলেন এই অঞ্চলের শিক্ষা জাগরণের স্থপতি ও সমাজ সংস্কারক মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল হক চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও একসময় শিক্ষা, যোগাযোগ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিক থেকে ছিল বেশ পিছিয়ে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দারিদ্র্য ও বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা মানুষের কাছে শিক্ষা যেখানে ছিল অনেকটাই বিলাসিতা, ঠিক সেই সময়েই একজন দূরদর্শী মানুষ উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি জাতিকে বদলে দিতে হলে প্রথমে বদলাতে হবে শিক্ষাকে। সেই দূরদর্শী মানুষটিই ছিলেন মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল হক চেয়ারম্যান—একজন সফল জনপ্রতিনিধি, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী এবং মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন চেয়ারম্যান ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি শিক্ষিত, আলোকিত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মহেশখালী গড়ার স্বপ্নের নাম।
বড় মহেশখালী ইউনিয়নের জাগিরাঘোনা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহান মানুষটি পিতা আলহাজ্ব আকতার কামাল ও মাতা আলহাজ্ব সুরত জামালের আদর্শে বড় হন এবং শৈশব থেকেই মানুষের সেবা ও সমাজ উন্নয়নের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। উল্লেখ্য, তিনি কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আলহাজ্ব আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি ছিলেন মানুষের অত্যন্ত আপনজন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তারই প্রমাণ বহন করে। তবে বিপুল ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তাও তাঁকে কখনো পরিবর্তন করতে পারেনি। তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়েছেন এবং নিজের অবস্থানকে মানবকল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত পরিচয় ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার মধ্যে নিহিত থাকে।
শিক্ষা বিস্তারকে আলহাজ্ব সিরাজুল হক চেয়ারম্যান তাঁর আজীবনের আন্দোলন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। দারিদ্র্য দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার যে শিক্ষা, সেই উপলব্ধি থেকে ১৯৮৫ সালে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মহেশখালী আইল্যান্ড হাই স্কুল’। আজ এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি বিদ্যালয় নয়, বরং মহেশখালীর শিক্ষা আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে শিক্ষা লাভ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ বিসিএস, মেডিকেল, প্রকৌশল, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, ব্যাংকিং ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় দেশের সেবা করে যাচ্ছেন। শিক্ষা বিস্তারের এই ধারাকে আরও গতিশীল করতে তিনি মহেশখালী ডিগ্রি কলেজ ও মহেশখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি বিদ্যালয় মানে শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়, এটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার প্রধান কারখানা।
সমাজসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই ব্যক্তিত্ব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে নিজের পবিত্র দায়িত্ব মনে করতেন। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বন্যা—যখনই মানুষ বিপদে পড়েছে, তিনি ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে ছুটে গেছেন দুর্গত এলাকায়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার ও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বড় মহেশখালী ইউনিয়ন মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতি লিমিটেড’। দীর্ঘ সময় জনপ্রতিনিধি থাকলেও বিনয় ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি কখনো বিলাসী জীবন বেছে নেননি। সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন ও সহজ-সরল আচরণ দিয়ে তিনি সবার হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালের ৫ ডিসেম্বর এই মহৎ প্রাণ ব্যক্তিত্ব ইন্তেকাল করেন। তবে তাঁর প্রয়াণে তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শ থেমে যায়নি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজও এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং তাঁর কর্ম মহেশখালীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আলহাজ্ব সিরাজুল হক চেয়ারম্যান কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি দর্শন। আজ যখন আমরা উন্নত, শিক্ষিত ও মানবিক সমাজ গঠনের কথা বলি, তখন তাঁর জীবন ও আদর্শ আমাদের পথ দেখায়। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল হক চেয়ারম্যানের এই মানবকল্যাণমূলক কাজগুলোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। মহৎ মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁদের আদর্শ ও কর্ম তাঁদের অমর করে রাখে যুগ থেকে যুগান্তরে।