
ক্লিক, অ্যালগরিদম ও বাণিজ্যিক চাপে বদলে যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমের চরিত্র!
➤একসময় একটি সংবাদ প্রকাশের আগে একজন সাংবাদিককে দিনের পর দিন মাঠে থাকতে হতো। তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং সম্পাদনা বিভাগের একাধিক স্তরের যাচাই-বাছাই শেষে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি ছিল সত্য, নিরপেক্ষতা, জনস্বার্থ এবং জবাবদিহি। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লবের পর সেই বাস্তবতা দ্রুত পাল্টে গেছে।
আজ একটি দুর্ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ভিডিও, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। কে আগে সংবাদ প্রকাশ করবে, কার ভিডিও বেশি ভাইরাল হবে, কার শিরোনামে বেশি ক্লিক পড়বে—এই প্রতিযোগিতা এখন সংবাদ শিল্পের বড় বাস্তবতা। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদমাধ্যমের এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি সাংবাদিকতার দর্শন ও পেশাগত নৈতিকতারও বড় রূপান্তর। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাঠকের মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লিকবেইট শিরোনাম, আবেগনির্ভর উপস্থাপনা এবং ভিউ-কেন্দ্রিক কনটেন্টও বেড়েছে, যা সংবাদে মানুষের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডিজিটাল যুগে সংবাদ শুধু তথ্য নয়, এটি একটি বাণিজ্যিক পণ্যও বটে। একটি সংবাদে কতজন ক্লিক করল, কতক্ষণ ভিডিও দেখল, কতবার শেয়ার হলো—এসব পরিসংখ্যানের ওপর অনেক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন আয় নির্ভর করে। ফলে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তেও অনেক সময় ডিজিটাল পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোন সংবাদ প্রথম পাতায় যাবে, কোন ভিডিও আগে প্রকাশ হবে, কোন শিরোনাম বেশি আকর্ষণীয় হবে—এসব সিদ্ধান্তে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে পাঠক এখন কেবলই ‘ডাটা’ বা সংখ্যায় পরিণত হয়েছেন।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভিউ সাংবাদিকতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে। যার মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম, বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসায়িক মডেল, ২৪ ঘণ্টার সংবাদ প্রতিযোগিতা, মোবাইল সাংবাদিকতার দ্রুত বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট তৈরির ব্যবহার এবং দর্শকের দ্রুত বিনোদনধর্মী কনটেন্ট দেখার প্রবণতা। এসব কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তথ্যের গভীরতার পরিবর্তে দ্রুততা ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমানে ডিজিটাল সাংবাদিকতায় সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হলো ক্লিকবেইট (Clickbait)। এ ধরনের শিরোনামের মূল উদ্দেশ্য থাকে পাঠককে কৌতূহলী করে ক্লিক করানো। যেমন—”অবশেষে যা ঘটল, কেউ ভাবেনি”, “ভিডিওটি না দেখলে বিশ্বাসই করবেন না”, কিংবা “মাত্র পাঁচ মিনিটে পাল্টে গেল সব”। অনেক সময় দেখা যায়, শিরোনাম যতটা নাটকীয়, প্রতিবেদনের ভেতরের তথ্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, ক্লিকবেইট মানুষের আবেগ ও কৌতূহলকে ব্যবহার করে পাঠক টানার চেষ্টা করে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভিউ সাংবাদিকতার এই জোয়ারে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়ছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে কখনও কয়েক সপ্তাহ, কখনও বা কয়েক মাস সময় লাগে। অন্যদিকে কয়েক মিনিটে তৈরি একটি উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখে ফেলতে পারে। এই বৈষম্যের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরিবর্তে দ্রুত কনটেন্ট তৈরির চাপ বাড়ছে। ফলে সময়সাপেক্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
ভিউ-কেন্দ্রিক সংবাদ পরিবেশনের ফলে সমাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর কারণে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভুল তথ্য সংশোধনের আগেই তা মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অনেক সময় বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে সামাজিকভাবে অপরাধী বানিয়ে ফেলা হয় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয়, যার ফলে সংবাদমাধ্যমের ওপর জনগণের আস্থা কমে যায়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যমকে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগোতে হবে, তবে সত্যতা ও জনস্বার্থের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না। এজন্য বাধ্যতামূলক তথ্য যাচাই (Fact-checking), শক্তিশালী সম্পাদকীয় তদারকি, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম পরিহার, সাংবাদিকদের ডিজিটাল যাচাই বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং ভুল হলে দ্রুত ও দৃশ্যমান সংশোধনী প্রকাশ করা জরুরি। একই সাথে পাঠকের মিডিয়া লিটারেসি বা সচেতনতা বৃদ্ধি করাও প্রয়োজন।
সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রযুক্তি বহুবার পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের তথ্য জানার অধিকার। আজও সেই নীতি অপরিবর্তিত। ভিউ, লাইক, শেয়ার ও অ্যালগরিদমের প্রতিযোগিতার মাঝেও যদি সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে, তবেই গণমাধ্যম তার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে পারবে। অন্যথায় সংবাদ ধীরে ধীরে তথ্যের উৎস না হয়ে, কেবল মনোযোগের বাজারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।